অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান ২০১৩


অতি সুপরিচিত ও বহুল সমাদৃত ‘অফ-ট্র্যাক বান্দরবান‘ সিরিজটির পর এবার শুরু হয়েছে নিশাচর-এর ‘অজানা লেকের অভিযানে বান্দরবান‘ ভ্রমণ-বৃত্তান্ত। দুটো পর্ব ইতোমধ্যেই দেয়া হয়েছে। বাকি পর্বগুলোর জন্য চোখ রাখুন nishachor.com-এ।

এখন থেকে এই ব্লগ nishachor.com-এ


স্বাগতম NISHACHOR.com-এ

সুপ্রিয় পাঠক, এখন থেকে এই ব্লগটি দেখা যাবে nishachor.com-এ এর নিজস্ব ডোমেইনে। আশা করি নিজস্ব ডোমেইনে এই ব্লগ সাইট আপনাদের সবার মনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে আরো নতুন নতুন সব ফিচার নিয়ে। আপনাদেরকে আজীবন পাশে পেতে চাই।
-মঈনুল ইসলাম
wz.islam@gmail.com

জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্যচিত্রে আমার তৈরি বাংলা সাবটাইটেল


মহাকাশ নিয়ে আমার আগ্রহ সেই ছোটবেলা থেকেই, টেলিস্কোপ (বিস্তারিত) নামক বস্তুটি আমার বড় আরাধ্য, কিন্তু এখনও হয়নি কেনা। তবু মহাকাশ দেখা হয় ফেসবুকে, মহাকাশ দেখা হয় ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল, হিস্ট্রি চ্যানেল আর নাসার হাত ধরে। লিখেছি বেশ কিছু নিবন্ধও। এরই ধারাবাহিকতায় একদিন দেখলাম ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের একটা ডকুমেন্টারি “Journey to the Edge of the Universe” (“মহাকাশের প্রান্তে যাত্রা”)। এই প্রামাণ্যচিত্রটা দেখার পর ঢাকার নভোথিয়েটারের আকাশ পরিচিতিটা বড় মেকি লেগেছে আমার। এই প্রামাণ্যচিত্রটা এতোটাই জীবন্ত, এতোটাই প্রামাণ্য, এতোটাই গোছানো আর বিজ্ঞানসম্মত যে, সেদিন থেকেই ভাবছিলাম, কিভাবে এই প্রামাণ্যচিত্রটা দেখানো যায় বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে। কিন্তু কোনোভাবেই উদ্যোগটা নিতে পারছি না।
কারণ, বাংলাদেশের মানুষের কাছে তথ্যচিত্রটা বোধগম্য করার জন্য এর ভাষা হওয়া দরকার বাংলা। চিন্তা করলাম এই তথ্যচিত্রটা বাংলায় অনুবাদ করে ডাব করবো। কথা বললাম বন্ধু বোরহান সোহেলের সাথে, সে সখের বশে শর্ট ফিল্ম   বানায়। সে আমাকে ধরিয়ে দিল বিষয়টা: একটা প্রচারযোগ্য ভিডিওকে ডাব করতে একটা বড় সমস্যা হলো এতে ভিডিও এবং অডিও লেয়ার দুটো একত্র (merge) করা থাকে। তার কথা থেকে বুঝতে পারলাম আমার উদ্দেশ্য সফল হবে না। কারণগুলো আবিষ্কার করলাম নিজে নিজে: একটা ভিডিওতে কমপক্ষে তিনটা লেয়ার থাকে:
  1. ভিডিও লেয়ার
  2. ধারাভাষ্যের বা বক্তব্যের লেয়ার
  3. এফএক্স লেয়ার বা আনুষঙ্গিক শব্দের লেয়ার

এখানে এই তিনটা লেয়ারই একত্র করা। আমি যদি বাংলায় ডাব করে সেই অডিও ফাইলটা তথ্য-চিত্রে জুড়ে দেই, তাহলে তা ঐ ইংরেজি ধারাভাষ্যের উপরে সুন্দর করেই বাংলা হয়ে যাবে কিন্তু একই সাথে ঢেকে দিবে আনুষঙ্গিক শব্দগুলোও, যেমন: শনির বলয় থেকে বেরোন শব্দ, বৃহস্পতির মেরুতে মেরুজ্যোতির র‍্যাডিয়েশনের ভোঁতা শব্দ, কিংবা একটা হাইপারনোভার বিকট শব্দও। এই শব্দগুলো ঢেকে গেলে এই ভিডিও’র কোনো মানেই থাকবে না।

কিন্তু আমাকে তো এই ভিডিও বাংলাদেশের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে… কী করা যায়? Read the rest of this entry

ভ্রমণ ২০১২ : শস্য-শ্যামলা উত্তর বাংলার টিউবওয়েলের মুখে (শেষ)


:: পর্ব ১ এবং পর্ব ২ ::

আমরা বাংলাদেশের সর্বউত্তর সীমান্তে বঙ্গমাতার শীর চুমে ফিরেছি আবার তেঁতুলিয়ায়। ফিরে দেখি আমাদের ভ্যানওয়ালারা অপেক্ষা করছে। বেচারারা আয়ের আশা ছাড়তে পারছে না। কিন্তু ও ব্যাটা অটোওয়ালা লাগালো বাগড়া: ভাই তিনশ’ ট্যাকায় অয় না, আপনেরাইতো দেকলেন, কদ্দুর পত। আমরা আমাদের মিডলম্যান ভ্যানওয়ালার দিকে তাকালাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝলাম, একটু বাড়িয়ে দিয়েই শান্তি আনতে হবে, তাই আরেফিন আরো বিশ টাকা বাড়িয়ে অটোকে ৳৩২০ দিয়ে নিবৃত্ত করলো।

ঠিক করা হলো, এখন আর বাংলোয় ফিরে না গিয়ে দিনের আলো থাকতে থাকতে যদ্দুর পারা যায় দেখে আসতে হবে। তাই সামান্য একটু বিশ্রাম নিতে সবাই চললো রেস্টুরেন্টে। আমি তখন তেঁতুলিয়া তেমাথায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি তেঁতুলিয়ার ১৯৭১-এর স্মৃতি-সৌধের: দুটো অসমান স্তম্ভের উপর একটা লাল টকটকে তেজস্বী কীরণ ছড়ানো সূর্য।

রেস্টুরেন্টে গিয়ে নাকিব আবিষ্কার করলো ক্যামেরার চার্জ এক্কেবারে নেই। চার্জার সাথেই ছিল, সাথে সাথে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারের ওখানে ক্যামেরাটা চার্জে দিলাম। আমাকে ব্যাটারি চার্জের সময় দিতে বিশ্রামকে আধাঘন্টায় স্থির করে দেয়া হলো। সবাই গরম গরম চা খেলাম আবারো (সাকুল্যে ৳৬০)। এবার বেরোবার পালা।

বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের ভ্যানওয়ালাদ্বয়, মামারা উঠেন। রওয়ানা প্রায় দিয়েই দিয়েছিলাম, হঠাৎ মাথায় খেললো, ভাড়া আগে ঠিক করে নেয়া সুন্নত: পরে ভাড়া নিয়ে তিক্ততার চেয়ে বিষয়টা আগেই মীমাংসা করা উচিত। ভ্যানওয়ালাদের বললাম, দেখেন, আপনারা কোথায় কোথায় যাবেন, কত নিবেন, আগে বলেন।

ভ্যানওয়ালা অত ঝক্কি চায় না, মামা আগে চলেন, আইসা ইনসাফ করে দিয়েন।

না মামা, ইনসাফ না। আগে বলে নেন, তারপর এসে যদি মনে হয় ন্যায্য হয়েছে কথা নাই, অন্যায্য হলে তখন আপনার ইনসাফ দেখা যাবে। আমরাও কিছু ঘুরাঘুরি করে বুঝছি ভাড়া কেমন। কতদূর যাবেন, সেটা ফিরে এসে বিবেচনা করে দেখা যাবে। কিন্তু আগে ভাড়া ফুড়ায়া নেন।

একজন তখন বললো, মামা আপনাদেররে চাবাগান, কমলা বাগান ঘুরা’য়া নিয়া আসবো, দুটা ভ্যান দুইশো ট্যাকা দিবেন।

এইত্তো সুন্দর। দুটো ভ্যানে দুদল ভাগ হয়ে গেলাম। এবারে ভ্যান, বাজারের তেমাথায় গিয়ে সোজাও গেল না, ডানে বাংলাবান্ধা কিংবা বাংলোর দিকেও গেল না, চললো বাম দিকের পথ ধরে। গ্রামের মেয়ে-মহিলারা বাইরে বসে রোদ পোহাচ্ছে, আর বৈকালিক বায়ুসেবন করছে, বাচ্চাকাচ্চারা রাস্তা ঘিরে খেলায় ব্যস্ত— গ্রামের এমন রূপ বহুদিন দেখি না। বিষ্ময় শুধু এতটুকুতেই না, বিষ্ময় আরো ছিল বাকি যখন দেখলাম নারী… চালাচ্ছে সাইকেল। Read the rest of this entry

ভ্রমণ ২০১২ : শস্য-শ্যামলা উত্তর বাংলার টিউবওয়েলের মুখে (প্রস্তুতি)


এই প্রস্তুতি “ভ্রমণ ২০১২ : শস্য-শ্যামলা উত্তর বাংলার টিউবওয়েলের মুখে” নামক ভ্রমণের প্রস্তুতি।
যার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ হলো: পর্ব ১, পর্ব ২, এবং পর্ব ৩-এ।

যারা এই ভ্রমণের বিবরণ পড়েছেন, তারা জেনে গেছেন, এই ভ্রমণ ছিল আমাদের এপর্যন্ত করা সব ভ্রমণের মধ্যে সবচেয়ে সর্বনিম্ন খরচের ভ্রমণ: জনপ্রতি মাত্র ৳১৮৫০। বোঝাই যাচ্ছে এটা সম্ভব হয়েছিল সরকারি ডাকবাংলো’য় থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ায়। ভ্রমণের যাবতীয় খরচের অনুপুঙ্খ উল্লেখ প্রতি মুহূর্তে দিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে লেখার এখানে-ওখানে। তারপরও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এখানে উল্লেখ করছি:তেঁতুলিয়া হলো পঞ্চগড় জেলার একটি উপজেলা এবং তেঁতুলিয়া যেতে হলে পঞ্চগড় হয়ে যেতে হয়। ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের গাড়ি ছাড়ে ঢাকার শ্যামলী, কল্যাণপুর থেকে। বাস আছে হানিফ, শ্যামলী, এবং নাবিল। ভ্রমণ শেষে ফিরে এসে শুনেছি, আবার বলছি ‘শুনেছি’, নাবিলের সেবা নাকি ভালো। হানিফ এবং শ্যামলীর মধ্যে শ্যামলীর বাস আমার কাছে তুলনামূলক প্রশস্ত এবং আরামদায়ক মনে হয়েছে। দীর্ঘ যাত্রা, তাই আরামের ব্যাপারটি অবশ্যই মুখ্য। হানিফের টিকিট নিয়েছিল জনপ্রতি ৳৫৫০।

যমুনা সেতু পার হয়ে একমাত্র যাত্রাবিরতিটি পাওয়া যায়। তারপর আরো দুই তৃতীয়াংশ পথ পাড়ি দিতে হয়। পঞ্চগড় জেলা সদর থেকে লোকাল বাস দিয়ে তেঁতুলিয়া যাওয়া যায়, কত নেয় আমার জানা নেই। আমরা শ্যামলীর বাসে করে গিয়েছিলাম, জনপ্রতি ৳৫০ দিয়ে।

সেখানে বাংলো পাওয়ার জন্য সরকারি মহলে হাত থাকতে হয়, কিংবা পরিচয়সূত্র থাকতে হয়। বাংলো পাওয়া গেলে খরচ অর্ধেকেরও কম: এক রাত থাকা রুমপ্রতি Read the rest of this entry

ভ্রমণ ২০১২ : শস্য-শ্যামলা উত্তর বাংলার টিউবওয়েলের মুখে (২)


আমরা সাড়ে চারশো কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে যে বাংলোয় থাকার নিশ্চিত অভিপ্রায়ে এসেছি এই সর্বদক্ষিণের উপজেলা তেঁতুলিয়ায়, সেই বাংলোর গেটে দাঁড়িয়ে নির্বিকারভাবে কেয়ারটেকার বলছে: ‘আমাকে তো কিছু জানাননি ইউএনও সাহেব।’আরেফিনের কপাল কুঁচকে গেল, কোঁচকালো আমাদেরও। সাথে সাথে আরেফিন ফোন করলো ইউএনও-কে। নেতা বলে কথা, পরিচয় দিয়ে ফোনটা ধরিয়ে দিলো কেয়ারটেকারের কানে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খুলে গেল গেট: ভিআইপি মর্যাদায় আমরা ঢুকে পড়লাম সরকারি সুবিধার ছায়াতলে। তা-ইতো হবার কথা: আরেফিন, বাস ছাড়ার সাথে সাথে আরেকবার কথা বলে নিয়েছিল রাতে, ইউএনও’র সাথে। মনে মনে হাফ ছাড়লাম আমি, আরেকটু হলেই ভেস্তে যেত সাধের বাংলো-বাস।

‘ডাকবাংলো’ নামে কেন যেন সরকারি এসব রেস্টহাউজগুলোকে ডাকা হয় সেটা জানা যাক: আমি লক্ষ করেছি, কোনো জায়গারই স্থানীয়দের মুখে এই শব্দটি শোনা যায় না, বরং যেটা শোনা যায়, সেটা হলো ‘ডাকবাংলা’, সিলেটেও যেমন সত্যি, এই তেঁতুলিয়ায়ও এর ব্যতিক্রম দেখিনি। ‘বাংলো’ (bungalow) যদিও অবশ্য ইংরেজি শব্দ; অর্থ: ছোট্ট বাড়ি, যার সাধারণত বড় একটা বারান্দা থাকে আর হয় একতলাবিশিষ্ট। তবে জেনে রাখা ভালো, এই ভারতবর্ষে এসেই হিন্দী ভাষার ‘বাংলা’ বাড়ি থেকে ব্রিটিশরা এই ‘বাংলো’ শব্দটি বানিয়ে নিয়েছে। খুঁজতে গিয়ে জানতে পারলাম: ‘ডাক’বাহী ঘোড়া আর আরোহীর বিশ্রাম আর রাত্রীযাপনের জন্য বানানো হতো এসব বাংলো, যা পরে সরকারি বিশ্রামাগার হিসেবে বেশি বানানো হতো।

তিনশ’ বছর পুরোন ডাকবাংলো দেখেই মনে হয় ট্যুরটা সফল হয়েছে (ছবি: লেখক)

তিনশ’ বছর পুরোন ডাকবাংলো দেখেই মনে হয় ট্যুরটা সফল হয়েছে (ছবি: লেখক)

তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো কিন্তু বহু আগের, প্রায় তিনশ’ বছরের পুরোন। এর অবস্থানটা আকর্ষণীয়: Read the rest of this entry

ভ্রমণ ২০১২ : শস্য-শ্যামলা উত্তর বাংলার টিউবওয়েলের মুখে (১)


“ধুত্তোর [গালি], এতো কম টাকায় ট্যুর, ক্যামনে কী?” – আরেফিনের উষ্মা শুনে বিশ্বাস হতে চাইছিল না, এটা সম্ভব হয়েছে! বাংলাদেশের ভিতরে দীর্ঘতম দূরত্ব অতিক্রম করলাম আমরা এপর্যন্ত সবচেয়ে কম খরচে।
পরিকল্পনাটার শুরু হয়েছিল ফেসবুকের একটা ফ্যানপেজ দেখে, দেখে নাকিব পাগল হয়ে যায়। তথ্যসূত্র হিসেবে জুটলো সামহোয়্যারইনব্লগের একটা ব্লগপোস্ট^। গুগল করতেই বেরিয়ে এলো আরো বেশ কিছু তথ্যক্ষেত্র। ইট-কাঠের শহরে দম বন্ধ হয়ে আসছে বলে ঐ তথ্যক্ষেত্রে হালচাষটা সে-ই করলো আদ্যোপান্ত, যে কাজটা বরাবরই আমি করে থাকি। এই ট্যুরের কোনো পরিকল্পনাতেই ছিলাম না আমি।

ভ্রমণের পরিকল্পনা হলো: ঢাকা থেকে তেঁতুলিয়া, বাংলাবান্ধা যাওয়া, সেখান থেকেই নাকি অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত হিমালয়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ চূঁড়া দেখা যায়। বাংলাদেশের ভূখন্ডে দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার দূর্লভ স্মৃতি পূঁজি করতে নাকিবের খুব সাধ। ব্লগ মারফত জানা গেল, ওখানে থাকার জন্য আদর্শ ব্যবস্থা হলো ‘জেলা পরিষদ ডাক বাংলো’। ভিতরে ভিতরে খোঁজখবর লাগিয়ে এর-ওর মাধ্যমে কিভাবে যেন আরেফিন ইউএনও’র সাথে যোগাযোগ করতে পারলো। লিংক কাজে লাগিয়ে নিশ্চিত করে ফেললো ডাক বাংলোয় থাকার ব্যবস্থা।

ভ্রমণের দুদিন আগেও আমি নিশ্চিত ছিলাম না, যাবো কি যাবো না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিভাবে যেন সব কিছু হয়ে গেল। নাকিব নিজ উদ্যোগে টিকেট করলো (ঢাকা-পঞ্চগড় : হানিফ এন্টারপ্রাইজ : জনপ্রতি ৳৫৫০)। ট্যুর-যাত্রী হলাম আমরা সাতজন: Read the rest of this entry

ভিট্রুভিয়ান ম্যান এবং ঐশ্বরিক অনুপাত


রাত তখন অনেক গভীর, সবাই ঘুমিয়ে গেছে। একজন মানুষের কোনো ঘুম নেই। লম্বা একটা জোব্বা গায়ে, শশ্রুমন্ডিত লোকটি বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। একটা লণ্ঠন একহাতে ধরে আরেক হাতে ধরেছে একটা গাঁইতি। গা ছমছমে পরিবেশে লোকটির যেনবা কোনোই ভয়-ডর নেই। সে গিয়ে ঢুকলো একটা কবরস্থানে। কোথাও ডেকে উঠলো একটা নিশাচর প্রাণী। গাঁইতি হাতে লোকটি, সদ্য কবর দেয়া একটা কবরে চলে গেল। খুড়তে শুরু করলো গাঁইতি দিয়ে। একসময় বেরিয়ে পড়লো কফিনটা। তারপর সেই কফিন থেকে লাশটা বের করে কাঁধে তুলে নিল লোকটা – একটুও ভয়-ডর নেই। লাশটাকে অন্ধকারে, চুপি চুপি নিয়ে এলো নিজের ঘরে। ঘরটায় যন্ত্রপাতি দিয়ে ঠাসা। মেঝেতে শুইয়ে রাখলো লাশটাকে। এবার আসল কাজ শুরু: লাশটাকে মেঝেতে বিছিয়ে রেখে লোকটি তার যন্ত্রপাতি নিয়ে শুরু করলো… কাটাছেঁড়া?? না, শুরু করলো জ্যামিতি।

 

ইতালির ভেনিসে, গ্যালারি দেল’এ্যাকাদেমিয়া-তে একটা চিত্রকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক দর্শক। খুব অল্প সময়ের জন্য চিত্রকর্মটির প্রদর্শনী হচ্ছে বলে প্রচুর লোকের সমাগম হয়েছে চিত্রকর্মটি দেখার জন্য, তাই সে বেশিক্ষণ সময় পাবে না এই ছোট্ট চিত্রকর্মটির সামনে থাকার। তবু সে একবার তাকায় নিজের টি-শার্টের বুকে ছাপা করা ছবিটির দিকে, আরেকবার তাকায় সামনের হলদে পাতায় আঁকা চিত্রকর্মটির দিকে: ভিট্রুভিয়ান ম্যান

মার্কাস ভিট্রুভিয়াস পোলিও (Marcus Vitruvius Pollio), প্রাচীন রোমের একজন স্থপতি। একটা বই লিখলেন তিনি, নাম “দে আর্কিতেকচুরা”। বিশাল বইটির তৃতীয় খন্ডে লিখলেন এক আশ্চর্য বিষয়: স্থাপত্যের আদি নীতির কেন্দ্রবিন্দু নাকি মানুষ। তিনি তাঁর বইতে বর্ণনা করলেন, মানুষ নাকি আশ্চর্য কিছু অনুপাতের মিশেল। তিনি এই অনুপাতগুলোকে স্থাপত্যের উপজীব্য হিসেবে ব্যাখ্যা করলেন।

বহু দূরে প্রায়ান্ধকার একটা কক্ষে এই বইটিই পড়ছিলেন একজন লোক। নাম তাঁর লিওনার্দো, ইতালির ভিঞ্চি গ্রামে জন্মগ্রহণ করায় তাঁকে সবাই ডাকে ভিঞ্চির লিওনার্দো, বা লিওনার্দো অফ ভিঞ্চি— লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। আজব সব শখ ছিল তাঁর, তারই একটা ছিল কবর থেকে লাশ তুলে এনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। কখনও কাটাছেঁড়া করে শারীরবিজ্ঞান-রহস্যোদ্ঘাটন, কিংবা কখনও জ্যান্ত মানুষকে দিয়ে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায় না, সেসবের আয়োজন। বিচিত্র এই মানুষটি ভিট্রুভিয়াসের বইয়ে মানুষ সম্পর্কে লেখা সেই অনুপাতের বিষয়টি পড়ে দারুণ রোমাঞ্চিত হলেন। চিত্রকর মানুষ, মনের মাঝে সবকিছুই ছবির মতো ভাসে… তিনি ঠিক করলেন এই অনুপাতের বিষয়টিকে চিত্রে রূপ দিবেন। সালটা আনুমানিক ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দ, জন্ম হলো ভিট্রুভিয়ান ম্যান-এর।

লিওনার্দো সব সময় তাঁর সঙ্গে রাখতেন কিছু নোটবুক। সেসব নোটবুকে তিনি যেমন লিখতেন তাঁর গবেষণালব্ধ বিভিন্ন বিষয়, তেমনি আঁকতেন বহু বহু ছবি। কিন্তু লিখতেন বড় আশ্চর্য ভঙ্গিতে, ইতালীয় ভাষায়, সব উল্টো হরফে। ফলে নোটবুকের লেখার মর্মোদ্ধার করতে দরকার হবে আয়নার। তারই একটা পাতায় তিনি আঁকলেন এই চিত্রকর্মটি:

লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ভিট্রুভিয়ান ম্যান

লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ভিট্রুভিয়ান ম্যান, ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দ

ছবিটিতে দেখা যায় একজন মানুষ, একটা বৃত্ত এবং একটা বর্গক্ষেত্রের মধ্যে খুব সাজুয্যপূর্ণভাবেই এঁটে যান। চলুন লিওনার্দো’র নোটবুক থেকেই এর ব্যাখ্যাটা শোনা যাক: Read the rest of this entry

দ্রুত গতিতে হাঁটার কলকব্জা


আমি খুব দ্রুত হাঁটি। অনেকেই আমার হাঁটা দেখে আশ্চর্য হোন, কিন্তু আমি এতে আশ্চর্যের কিছু পাইনি। কারণ আমি মনে করতাম যে-কেউ চাইলেই দ্রুত হাঁটতে পারেন। কিন্তু আমার ভিতরের কলকব্জাটা বুঝতে পারলাম আমি যখন আমারই মতো আরেকজনকে দেখলাম। …আসুন দেখা যাক কিভাবে দ্রুত হাঁটা যায়:

মাথাটা ঘুরছে, টালমাটাল হয়ে পড়ে গেলেন লোকটি

এই কথাটি আমরা সবাই বুঝতে পারছি। আসলে কিন্তু বিষয়টা বুঝতে পারছি না, কিংবা গভীরে গিয়ে বুঝবার চেষ্টাও করছি না। আসলে কিন্তু এই কথাটির মধ্যেই রহস্যটা লুকিয়ে আছে। আপনি মোটা, সেটা বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে আপনি হাঁটার সময় আপনার উর্ধাঙ্গ দুলছে কিনা। যাদের উর্ধাঙ্গ, হাঁটার সময় [পরিষ্কার করে বললে ডানে-বামে] দুলতে থাকে, তাদের হাঁটার গতি সেই দুলাদুলির কারণে স্থিমিত হয়ে পড়ে।

আমি যতদূর জানি, গাড়ির ক্ষেত্রে এই নীতিটি খুব মেনে চলা হয়। যেসকল গাড়িকে দ্রুত গতিতে ছোটার জন্য তৈরি করা হয়, তাদেরকে যথাসম্ভব নিজের অক্ষের উপর স্থির থাকার সক্ষমতা দেয়া হয়।

সুতরাং আপনাদের নিশ্চয়ই আর বোঝার বাকি নেই: যদি দ্রুত গতিতে হাঁটতে হয়, তাহলে নিজের উর্ধ্বাঙ্গকে স্থির রেখে হাঁটতে হবে। তখন আপনি যথেষ্ট দ্রুতগতি অর্জন করতে পারবেন আপনার হাঁটায়। এজন্য স্লিম স্বাস্থ্য একটা ক্রাউটেরিয়া ঠিক, তবে তা আবশ্যিক নয়, অনেক মোটা মানুষও এই নীতি মেনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

আমি সেদিন ট্রেনে বসে প্লাটফর্মে হেঁটে যাওয়া এক যুবককে দেখে বিষয়টা প্রথম আঁচ করি। পরে পরীক্ষা করে দেখি, ঠিক: আমি চলার সময় আমার উর্ধ্বাঙ্গ যথেষ্ট শক্ত থাকে, যেনবা শিরদাঁড়ায় একটা তক্তা বেঁধে দেয়া হয়েছে।

 

সাবধানতা:

দ্রুত গতিতে ছোটা গাড়ি কিন্তু দুর্ঘটনা-কবলিত হয়। তাই দ্রুতগতিতে হাঁটার জন্য দরকার: অবস্থার প্রেক্ষিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবার, এবং দ্রুত থমকে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। আমি বিশ্বাস করি, আমার মস্তিষ্ক একটু ধীরে চলে, আমি কোনো কথা শোনার পর বেশ সময় লাগে কথাটা বুঝতে (টিউবলাইট গোছের); কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখি, আমি আমার পথের বাধাগুলো খুব দ্রুত সনাক্ত করতে পারি এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে হয় জায়গার মধ্যে থমকে দাঁড়াতে পারি, নতুবা দ্রুত পাশ কাটাতে পারি। তাই এই দুটি ক্ষমতা আপনার থাকতে হবে, যদি আপনি দ্রুত হাঁটেন। (নয়তো কখনও কোনো মেয়ের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লে লজ্জার অন্ত থাকবে না; আর গুন্ডাগোছের কারো গায়ে পড়লে জান্নাত-জাহান্নাম এক করে দিবে…)

তবে এজন্য আপনাকে একটা স্যাক্রিফাইস করতে হবে, মানে ছাড় দিতে হবে: রাস্তায় হাঁটার সময় পূর্ণ মনোযোগ আপনার থাকতে হবে আপনার পথের উপর, আর আপনার গন্তব্যের উপর। এতে আপনি আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া অনেক আকর্ষণীয় ঘটনা মিস করতে পারেন।

দ্রুত হাঁটার অনেক স্বাস্থ্যগত উপকারিতা আছে: চর্বি কমে…। (এমনই কমে যে, আমি সবসময়েরই under-weight আছি :() তবে দ্রুত হাঁটা আপনাকে উপহার দিবে সুস্থতা…।

তাড়াহুড়া করে পোস্ট লেখা আমার যুক্তিতে নাই। তবু মিসির আলী অনেক অযৌক্তিক কাজই করে ফেলেন এবং তারপর ভাবেন, এইমাত্র আমি যুক্তির বাইরে একটি কাজ করে ফেললাম।

-মঈনুল ইসলাম

wz.islam@gmail.com

সার্ভাইভাল অভিজ্ঞতা: তরু-কুটিরে আমরা ক’জন সৌখিন সার্ভাইভার


তরু-কুটির থেকে এভাবেই দেখা যায় হাকালুকি হাওর (ছবি ও প্যানোরামা প্রস্তুত: লেখক)

বর্ষাবনে বৃষ্টিতে ভিজে কোনোরকমে একটা মাথা গোঁজার স্থান করেছেন বিয়ার গ্রিল্‌স^। এবার আগুন ধরাতে হবে। গাছের ভিতরের ছাল, আর হালকা-ভেজা কাঠ দিয়েই কিভাবে যেন আগুন ধরিয়েও ফেললেন তিনি। ব্যস, এইমাত্র ধরা খরগোশটাকে পুড়িয়ে খাবার পালা – ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড টিভি অনুষ্ঠানটির এই দৃশ্যটি বাস্তব(?)। কিন্তু দ্ব্যর্থহীন বাস্তব হচ্ছে আমাদের নিজস্ব তরু-কুটিরে বসে তাজা মাছ পুড়িয়ে খাওয়া। …এমনই সহজ? দেখা যাক?

১৬ আগস্ট ২০১২ যখন নতুন ট্রেন কালনীতে করে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলাম ঈদ-উল-ফিতর পালন করতে, তখন খুবই বুঝতে পারছিলাম যে, এবারের ঈদটি হবে মনে রাখবার মতো। কিন্তু ভাবিনি, তা সত্যিই হবে। এবারের ঈদের বিশেষত্ব ছিল অনেক: চাচা লন্ডন থেকে এসেছেন, ফুফু দশ বছর পর আমেরিকা থেকে এসেছেন, আমার প্রবাসী বাবাও সাথে আছেন – সুতরাং এবারের ঈদে আনন্দের সীমা থাকবে না।

আমার গ্রামের বাড়ি সিলেটের মৌলভীবাজারের বড়লেখায় (বিস্তারিত পাবেন এখানে)। বাড়িতে যাবার পরপরই আমার সঙ্গী হলো বাড়িতে থাকা চাচাতো ভাই [এইচএসসি পড়ুয়া] আমজদ, [স্কুল পড়ুয়া] আশফাক, আর বেড়াতে আসা ফুফাতো ভাই [স্কুল পড়ুয়া] রাফি। বাকিরা কেউ বয়সে বেশ ছোট, আর অন্যান্য কাযিনরা তখনও এসে পৌঁছায়নি। বাড়িতে ঘুরছি-ফিরছি, নীরবতা খুঁজে বেড়াচ্ছি, কারণ প্রকৃতির মাঝে নীরবতাটা আমি বেশি পছন্দ করি; এমন সময় আমজদ এগিয়ে এলো পুকুর পাড়ে। আমাদের পুকুরের পশ্চিম পাড়ের একটা জায়গা দেখিয়ে জানালো, বিদেশ ফেরত চাচা এই জায়গাটা পরিষ্কার করে রেখেছিলেন মাঁচা বানানোর জন্য।

ব্যস, আর যায় কই? রোজা রেখেই সেদিন দুজনে কাজে লেগে গেলাম, ঠিক করলাম আমরাই একটা মাঁচা বানিয়ে ফেলবো জায়গাটায়। আমার মনে যেখানে বিয়ার গ্রিল্‌স-এর সার্ভাইভাল টেকনিক কাজ করছে, সেখানে আমজদের মনে যে খেলাঘর বানানোর নেশা চেপেছে সে আর কিছু না, বয়সের দোষ!:)

খেলাঘরচ্ছলে তরু-কুটির

বাড়ির এক জায়গায় কয়েকটা বাঁশ কেটে রাখা হয়েছে, ব্যস দা নিয়ে দুজনে লেগে গেলাম ওখান থেকে প্রয়োজনীয় বাঁশ কেটে নেবার জন্য। আমাদের নির্ধারিত জায়গাটার চারপাশে চারটা সুপারি গাছ। উপকরণ যা যা লাগবে বলে স্থির করা গেল:

  • বাঁশ (মাঁচার জন্য)
  • সুতলি আর স্টিলের তার (বাঁধার জন্য)
  • দা (বাঁশ ও অন্যান্য বস্তু কাটার জন্য)

বাঁশ কাটতে গিয়ে বুঝলাম অনভ্যস্ততায় বিষয়টা খুব একটা সহজ কিংবা সুখকর না। আমি দা খারাপ চালাই না, কিন্তু দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে নিশানা আর হাতে জং ধরেছে বেশ, এদিকে বাঁশগুলোও বুড়ো, তাই বেশ শক্ত। তার উপর রোজা রেখে কাজটা সহজেই হাঁপিয়ে উঠার মতো। বাঁশগুলোকে প্রথমে প্রয়োজনীয় আকারে কেঁটে নিতে হবে, তারপর দুটো আস্ত বাঁশ রেখে বাকিগুলোকে মাঝখান দিয়ে চিরে আধফালি করতে হবে। আরেকটা ছোট কাজ হলো আধফালি করা বাঁশগুলো আবার চেঁছে পরিষ্কার করতে হবে, কারণ ওগুলো দিয়ে বসার স্থান বানানো হবে, সেখানে ধারালো কিছু থাকলে কাপড় ছিঁড়তে পারে। একেকটা বাঁশ আধফালি করতে বেশ পরিশ্রম হচ্ছে, যেখানে আমিই হাঁপাচ্ছি, সেখানে বয়সে ছোট আমজদ যে ক্লান্ত হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, এখানে বিয়ার গ্রিল্‌স একা নন, দুজন বিয়ার গ্রিল্‌স একত্রে কাজ করছে। Read the rest of this entry

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 83 other followers

%d bloggers like this: